শব্দের আলমারি
-শতাব্দী চক্রবর্তী
লোকটা পাশে এসে বসাতে মেয়ে একটু সরে বসল। প্যান্ট গোটান, পায়ে কাদাভরা হাওয়াই চটি,
হাতে বাজারের ব্যাগ। এই ব্যাগের অন্য কোন নাম থাকলেও সে জানে না। তাদের বাড়িতে ওই ব্যাগে করেই বাজার আনা হয়,
কি অবহেলায় ঝুলতে থাকে ব্যাগ। গায়ে তার কত দাগ, কালশিটে। সব্জি খসা রস, ছাগল-মুরগি-মাছেদের রক্তের ছোপ। মাছ কাটা বঁটিটার কষ্ট কিম্বা যে কাটে তার রক্তের ছাপ আছে কিনা জানে না সে। শুধু দেখেছে বাজার ঢেলে নেওয়ার পর,
ছুঁড়ে সিঁড়ির উপর ফেলে দেওয়া হয়। ব্যাগ, অযত্নে বেড়ে ওঠা বাচ্চাদের মতো রোদ খায়— শুকিয়ে ওঠে। তারপর তাকে সিঁড়িঘরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সিঁড়িঘর মানে যেখানে কেউ যায় না। নামী-দামী লোক বা নেহাতই বাইরের লোকদের থেকে আড়াল করা হয় তাকে। তো এইরকমই একটা ব্যাগ হাতে লোকটা পাশে এসে বসাতে মেয়ে যে সরে যাবে,
এই স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিকের ওপর ভরসা রেখেই মেয়ে সরে গিয়ে তার বকফুল সাদা ব্যাগ থেকে ম্যাগাজিন বের করল। অবশ্যই লিটল।
পড়ছে মেয়ে আর আড় চোখে দেখে নিতে চাইছে ব্যাগওলা মানুষকে। চোখ কি ফোলা-ফোলা,
লাল-লাল? মুখ দিয়ে গন্ধ বেরোবে? পায়ের লোমগুলো দেখে শিউলি গাছে জমে থাকা শুঁয়োপোকাদের মনে পড়ে। এই দেখা,
ভাবনাদের নিয়ে চোখ চালাচ্ছে মেয়ে। তার চোখকে অবাক হতে হল। ম্যাগাজিনের পাতার উপর সেই লোকের চোখ দেখে, তাকানো— সরলতা দেখে। মেয়ে পড়ছে আর অপেক্ষা করছে লোকটার জন্য। আর একটু কি থেমে থেমে পড়া উচিত?
বুঝতে পারছে সব কথার মানে?
ডিকশনারি মানে জানে?
মেয়ের ইচ্ছে করল বুঝিয়ে বলে ডিকশনারি মানে শব্দের আলমারি। এর মানে ওটা,
তার মানে সেটা।
মেয়েকে নামতে হল। যে সব কারণে নেমে পড়তে হয় তারই কোন একটার জন্য। ফিরতে ফিরতে মনে পড়ছিল ভদ্র মুখেদের—ব্যাগেদের—জুতোদের। তাদের চরিত্র বদলান ভাবতে ভাবতে শিউরে উঠল কি?
মুখোশ খুলে যাওয়া মুখেদের দেখতে দেখতে কেঁপে উঠল?
ঘুমিয়েছিল বোধহয়। স্বীকৃতি দেওয়া যায় না বলেই তো ঘুমের কথাদের আমরা স্বপ্নই বলি। সেইরকমই কিছু একটা হবে। মেয়ে দেখল সেই কাদা পায়ের লোক হেঁটে যাচ্ছে। যেসব শব্দগুলোকে তার জন্য কঠিন মনে হয়েছিল সেই কথাদেরই নিয়ে হাঁটছে লোক। কাগজ থেকে বেরিয়ে এসেছে শব্দের নদী। সেই অবহেলার ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এল শব্দের আলমারি। নদীর পাড়ে নতুন, নতুন জামা পরে শব্দেরা ছুটছে, তাদের পায়ে কাদা লেগে যাচ্ছে।

সুন্দর লেখা । ভাবনাচিন্তার ফ্লো বেশ ভালো । কিছু জায়গায় অতিকথন এড়িয়ে আরো ছিমছাম করা যেতো
ReplyDelete